Tuesday, July 3, 2012

১৬ কোটি মানুষের কী দোষ?

আনিসুল হক 


গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আমাদের গ্রামের বাড়ি। আগে ওই এলাকায় কার্তিক মাসে আকাল পড়ত, ওই গ্রামের বহু লোক অনাহারে-অর্ধাহারে থাকত। এখন কার্তিকের সেই মঙ্গা আর আমাদের গ্রামে নেই। এর একটা কারণ হলো, আমাদের গ্রামে এখন কলার চাষ হয়। কার্তিক মাসে কলা ওঠে, সেটা বেচে এলাকাবাসী অন্ন জোগাড় করতে পারে। আগে কেন তাহলে কলার চাষ হতো না? এখন কেন হয়? কারণ, যমুনা সেতু। আমাদের গ্রামে খড়ের ঘরগুলো টিনের ঘর হয়ে গেছে। একটা সেতু একটা জনপদের চেহারা পাল্টে দিতে পারে, এটা আমরা চোখের সামনে ঘটতে দেখলাম।
পদ্মা সেতু যে আমাদের খুবই দরকার, এটা সবাই জানে। ২০১০ সালেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ ভাগ বাড়িয়ে দেবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য পদ্মা সেতু জিডিপি বাড়াবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তিন কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে এই সেতুর দ্বারা। জিডিপি বাড়লে উপকৃত হবে পুরো দেশ, দেশের ১৬ কোটি মানুষ। দেশের ওই অঞ্চলটা এখন সবচেয়ে গরিব। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করাও তো আমাদের কর্তব্য। তারও পরে পদ্মা সেতুর সঙ্গে যুক্ত আছে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নটি, সোজা কথায় ভারতের জন্য ট্রানজিট।
পদ্মা সেতু যে আমাদের দরকার, সেটা আমরা খুব ভালোভাবে জানি, বিশ্বব্যাংকও জানে, আর জানে বলেই তারা অর্থ বরাদ্দ করতে এগিয়ে এসেছিল। এখন তারা অর্থ বরাদ্দ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। কারণ, তারা দুর্নীতির অভিপ্রায়ের প্রমাণ পেয়েছে এবং সেটা উচ্চপর্যায়ে।
এইখানে এই পুরোনো গল্পটি আপনাদের মনে করিয়ে দিই। সন্তান কার, এই নিয়ে ঝগড়া বেধেছে দুই মহিলার। দুজনই দাবি করছেন, সন্তান তাঁর। কাজির আদালতে বিচারপ্রার্থী হলেন দুজনেই। কাজি বললেন, বাচ্চাটাকে তরবারি দিয়ে মাঝ বরাবর দু-টুকরো করো, তারপর দুজনকেই অর্ধেকটা করে দিয়ে দাও। একজন বললেন, ঠিক আছে, আপনি বাচ্চা ওকেই দিয়ে দিন। আমার বাচ্চা লাগবে না। কাজি বললেন, একেই বাচ্চা দিয়ে দাও, এই হলো প্রকৃত মা। প্রকৃত মা তাঁর সন্তানের কোনো ক্ষতি চান না।
বিশ্বব্যাংকের কী যায়-আসে, যদি বাংলাদেশের মানুষ গরিবই থেকে যায়, এক অঞ্চলের মানুষের চলাচলে ও জীবনযাপনে অসুবিধা হয়, তারা বৈষম্যের শিকার হয়। আসবে-যাবে আমাদের। কারণ, এ যে আমাদের দেশ, এই প্রকল্প যে আমাদের নিজেদের প্রকল্প।
আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে এসে, অনেক টাকা-পয়সা খরচাপাতি করে, সম্ভাব্যতা যাচাই, ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ দান, নকশা চূড়ান্তকরণ—সব সম্পন্ন করে তো এখন বলতে পারব না, খেলব না। এ তো আমাদের জন্য ছেলেখেলা নয় যে খেললাম খেললাম, না-খেললাম, চলে গেলাম। হে বালকগণ, তোমাদের জন্য যা ছেলেখেলা, আমাদের জন্য তা জীবনমরণ সমস্যা।
যেহেতু মাথা আমার, তাই মাথাব্যথাও আমার। সেখানেই আমাদের উচিত ছিল, বিষয়টা পেশাদারি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা। বিশ্বব্যাংক কোনো ধোয়া তুলসী পাতা নয়। তাদের বিশেষজ্ঞরাও পৃথিবীজুড়ে সব সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছেন, কথাটা তেমনও নয়। বিশ্বব্যাংকের বিষয়ে বহু সমালোচনা আছে, তার কতকটা নীতিগত, কতকটা আচরণগত। পদ্মা সেতু নিয়ে তারা যে একটা চীনা কোম্পানির পক্ষে জোর সুপারিশ করছিল, যারা পূর্ব-অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে ভুয়া ছবি দাখিল করেছিল, নিজেদের কাজ হিসেবে চীনের সেতু দেখিয়ে ছবি জমা দিয়েছিল আমেরিকার এক সেতুর, সেটা ধরাও পড়ে—সে কথা এখন আমাদের মন্ত্রীও জানাচ্ছেন, এই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক প্যানেলের চেয়ারম্যান জামিলুর রেজা চৌধুরীও সেটা লিখে জানিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। অর্থমন্ত্রী সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সন্দেহ নিরসনে আমরা অসাধারণ সব পদক্ষেপ নিয়েছি।’ অর্থাৎ আমাদের সরকার সব সময়েই চেয়েছে, এবং এখনো চাইছে, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে সরে না যাক, তারা এবং তার সঙ্গে অন্য উন্নয়ন-সহযোগীরা পদ্মা সেতুতে তহবিল জোগাক। আপাতত, সরকারের এসব ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’-এর ফল কী? বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। এখন বাংলাদেশের সামনে বিকল্প করণীয় কী? এক. বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া, তাদের বুঝিয়ে রাজি করানো, বাতিলকে বাতিল করে প্রকল্প আবার সচল করা। দুই. বিকল্প উৎস থেকে টাকা জোগাড় করা। আমরা জানি, বিকল্প উৎস আসলে নেই, দেশে এত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় নেই, আর বিশ্বব্যাংকের মতো নামমাত্র সুদে ও বহু বছরের মেয়াদে আর কোনো উৎস থেকে তহবিল জোগাড় করা যাবে না।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ যে বলছে, কোনো রকমের দুর্নীতি হয়নি বা দুর্নীতির কোনো সাক্ষী নেই, এ কথাটা কি দেশের মানুষ বিশ্বাস করে? আমার নিজের ধারণা, দুর্নীতিতে বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়নের কণ্টকমুকুটশোভা যার মাথায়, ‘আমরা কোনো রকমের দুর্নীতি করি নাই, করতে চাইও নাই’—তার এ রকম দাবি সত্য হলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। 
ঘুরেফিরে কিন্তু সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের কথাই আসে। বিশ্বব্যাংক নাকি তাঁর পাসপোর্ট আর ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে বলেছিল। ওদিকে খোলাখুলি না হলেও ঘুরেফিরে ইনিয়ে-বিনিয়ে, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের উত্থাপিত প্রশ্নের মধ্যে কথাটা এসে যাচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্থা না করার যে অনুরোধ আমেরিকার পক্ষ থেকে করা হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের কাছে, তাতে কর্ণপাত না করার কোনো প্রভাব পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত কি না! অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর জানা নেই।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশের নেতৃত্ব বিষয়ে আমার বক্তব্য দুটো। এক. আমরা কি খুব একগুঁয়েমি দিয়ে চালিত হচ্ছি? সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর সময় একটা জোর আওয়াজ উঠেছিল যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের। ওই সময়, ঈদের প্রাক্কালে দেখা গেল, আমাদের মহাসড়কগুলো খানাখন্দময়। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে বাসমালিকেরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। সেটাই ছিল সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগের আদর্শ সময়। ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে ভারতের রেলমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, নিশ্চয়ই তিনি নিজের রেলগাড়ি চালাচ্ছিলেন না, সিগন্যালও তিনি ওঠান-নামান না, তবু তিনি পদত্যাগ করেন, এটা বোঝাতে যে সরকার জেগে আছে, তাদের বিবেক ক্রিয়াশীল আছে। আমাদের দেশে মনে হয়, গন্ডারের চামড়া আমাদের, বকো আর ঝকো, কানে দিয়েছি তুলো, মারো আর ধরো, পিঠে বেঁধেছি কুলো। এক আবুল হোসেনকে মন্ত্রীর পদে রেখে দেওয়া কি তিন কোটি মানুষের ভাগ্যবদলের চেয়েও জরুরি? আমি বলছি না, আবুল হোসেন দুর্নীতি করেছেন, কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার জন্য তাঁকেই মানুষ দায়ী বলে ভাবে, এটা মানুষের ধারণা, মানুষের ধারণা প্রমাণ-সাক্ষী দিয়ে চলে না, একটা ভাবমূর্তি জনসমক্ষে নানা কারণে নানাভাবে তৈরি হয়েই যায়। কাজেই আবুল হোসেন যে কেবল পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য একটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তা নয়, তিনি তো এই সরকারের ভোট ও জনসমর্থনের জন্যও একটা বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিন কোটি লোকের স্বার্থ বা পদ্মা সেতু তো পরের প্রসঙ্গ, এই সরকার কি আরেকবার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতে চায় না? এই রহস্য আজও অনুদ্ঘাটিতই রয়ে গেল, কেন একজন মাত্র মানুষকে মন্ত্রী করে রাখাটা এত জরুরি হয়ে পড়ল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যদি তদন্তের স্বার্থের কথা বলে পদত্যাগ করতে পারেন, তাহলে আবুল হোসেন ‘যেহেতু বিতর্ক উঠেছে, তাই তদন্তের স্বার্থে আমি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করছি’ বলে কেন সরে দাঁড়ালেন না। তারপর তদন্তে যদি প্রমাণিত হতো, তিনি অহেতুক অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন, আমরা গিয়ে তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে আসতে পারতাম।
অনেক সময় মনে হয়, সরকার নিজেকে খুবই শক্তিশালী মনে করে। হিলারি ক্লিনটনের সফরের পরপরই তাঁর সমালোচনা এমন তীব্রভাবে আমাদের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা করতে লাগলেন, মনে হতে লাগল, আমেরিকা প্রতিবছর বাংলাদেশের কাছে ভিক্ষার থলে নিয়ে এসে হাজির হয়। যেন বাংলাদেশ পৃথিবীর একটা সুপার পাওয়ার, আর আমেরিকা একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশ। এ-জাতীয় কথামালার যে কোনো মানে হয় না, সেটা আমরা সবাই জানি। 
এখন মনে হচ্ছে, বেশ একটা জেদাজেদির মধ্যে পড়ে গেছে পদ্মা সেতু। তার শিকার হচ্ছে দেশের ১৬ কোটি মানুষ। বিশ্বব্যাংকের উদ্দেশে বলা যায়, তিনজন মাত্র লোকের জন্য তো একটা দেশের ১৬ কোটি মানুষ দুর্ভোগ পোহাতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের উপকারে আসে এমন প্রকল্প সম্পন্ন হতে সাহায্য করা, কয়েকজন মাত্র মানুষের জন্য কোটি মানুষের প্রকল্প থেকে ‘খেললাম না’ বলে চলে যাওয়া নয়। বিশ্বব্যাংকও ভুল করে। বিশ্বব্যাংকের সুবিধা হলো, বাংলাদেশে তারা আইন প্রণয়ন করিয়ে নিতে পেরেছে, তাদের কোনো আচরণের জন্য বাংলাদেশের আইনে তাদের ধরা যাবে না। বাংলাদেশের নেতা-কর্মী-আমলা-পেশাজীবী কারোরই তো সেই ঢাল নেই।
আর সরকারকে বলব, আবুল হোসেন কী করেছেন, কী করেননি বা প্রকল্প পরিচালক কী করেছেন, কী করেননি, তার দায় তো জনগণের নয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের ওপরে কেন আপনি উচ্চ হারে সুদের ঋণ চাপিয়ে দেবেন? আপনার লোকদের ভাবমূর্তি খারাপ, তার দায়িত্ব তো ১৬ কোটি মানুষ বহন করতে পারে না।
আর দেশের সার্বিক ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? শুধু এই এক প্রকল্পে নয়, জাইকা, এডিপি অন্য প্রকল্পেও টাকা ছাড় দেওয়া স্থগিত করে রেখেছে। শুধু টাকার অঙ্কেই বা কেন ক্ষতি বিবেচনা করব, আমাদের সম্মানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় তো নেতাদের নিতেই হবে।
পলিটিকস ইজ দি আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। জিদ ধরে বসে থাকা কোনো কাজের কথা নয়। চোরের ওপরে রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার মানে হয় না। তিনজন মানুষকে বসিয়ে দিলে বা সরিয়ে দিলে যদি পদ্মা সেতু হয়, সেটা করাই কি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় ছিল না?
এখন তো পুরো ব্যাপারটা বেশ লেজেগোবরে হয়ে গেছে। এখন বিচারিক তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত তো অপরিহার্য। দোষী কাউকে পাওয়া গেলে তাকে শাস্তিও দিতে হবে। আর না পাওয়া গেলে তো কোনো কথাই নেই।
অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দেশের সম্মান রক্ষার কথা। অর্থমন্ত্রী নিশ্চিত যে, ‘দুর্নীতি বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, কোনোমতেই সেগুলো সঠিক নয়।’ অর্থমন্ত্রী যেহেতু নিশ্চিত, সে ক্ষেত্রে খুব নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। 
অর্থমন্ত্রী আরেকটা খুব মূল্যবান কথা বলেছেন। ‘আশা করব, দেশের সম্মান রক্ষার ব্যাপারে সজাগ থাকবেন।’ দেশের সম্মান রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। আমাকে একজন শিল্পোদ্যোক্তা, যার বিশাল এক শিল্পোদ্যোগের তহবিল একই কারণে আটকে আছে, দুঃখ করে বলেছিলেন, সারা পৃথিবীতে বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজ বিশ্বব্যাংকের সমালোচনায় মুখর আর বাংলাদেশে কয়েকটা লোকের কথিত দুর্নীতির অভিপ্রায়ের কারণে ১৬ কোটি লোকের প্রকল্প বিশ্বব্যাংক আটকে দিচ্ছে, আপনারা তার প্রতিবাদ করছেন না কেন?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Tuesday, June 19, 2012

কুড়ি বছর পরের বাংলাদেশ


আনিসুল হক

আজ থেকে কুড়ি বছর পরে, ২০৩২ সালে, কেমন হবে বাংলাদেশ? 
আজকের সংবাদপত্র খুলে কোথাও কোনো আশা দেখতে পাই না। আশুলিয়ায় পোশাক তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ, শ্রমিকেরা রাস্তায়, প্রাণপণ লড়াই করছে পুলিশের সঙ্গে। সংবাদপত্রের শিরোনাম, আশুলিয়া-কাঁচপুর রণক্ষেত্র। এসব শিরোনাম আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে, শব্দ তার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য হারিয়েছে, রণক্ষেত্র মানে যে যুদ্ধের ময়দান, এই কথাটা আমরা, পাঠকেরা খুব আর ভেবে দেখি না। অন্যদিকে, শেয়ার মার্কেটের হতাশ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় বসে পড়েছেন। খবরে প্রকাশ, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার ছেড়ে যাচ্ছেন। মহাসড়কে খানাখন্দ। সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক, তার ওপর যানজট। ঢাকা শহর চলে না, কিন্তু ঢাকা থেকে বাইরেও যাওয়া কষ্টকর। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা খুলনা বা রাজশাহী বা সিলেট বা ময়মনসিংহ যাত্রা করলে গন্তব্যে কখন পৌঁছানো যাবে, কেউ বলতে পারে না। অন্যদিকে, টিআইবির বার্ষিক সাধারণ সভায় ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দুর্নীতির ব্যাপকতায়’ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আরেকটি সেমিনারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শুধু অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নয়, আন্তর্জাতিক দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। দেশের বড় বড় দুর্নীতিবাজ শাস্তি না পেয়ে উল্টো পুরস্কৃত হচ্ছেন বলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।... দেশীয় দুর্নীতিবাজদের অনৈতিকতা ও অবক্ষয়কে রাষ্ট্র থেকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কুইক রেন্টালে ব্যাপক দুর্নীতি হলেও এ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না নির্দেশ রয়েছে। এ জন্য এ খাতের অবস্থা এখন যথেচ্ছা হয়ে পড়েছে।’ (দৈনিক যুগান্তর, ১৮ জুন ২০১২) মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের বস্তা বাঁধতে ব্যস্ত, দেশ শেষ হয়ে যাক, মানুষ নিশ্চিহ্ন হোক; পরিবেশ, ও আবার কোন বালাই! এটা সলিমুদ্দি-কলিমুদ্দির মনোভাব হলে এক; কিন্তু শীর্ষস্থানীয়রা, ক্ষমতাবানেরা যখন কেবল নিজের পোঁটলাটা সামলাতে ব্যস্ত, তখন আশার আর কোনো জায়গা থাকে না। তখন সবকিছু ভেঙে পড়ে! তখন রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে, পুলিশ কথা শোনে না, বাতি জ্বলে না, সেতুর জায়গায় সেতু গড়ে ওঠে না। আমরা কেবল দুর্নীতিবাজ নই, আমরা অদক্ষও। বছর শেষে বাজেট ফিরে যায়, কারণ আমরা খরচ করতে পারি না। বাজেট যাতে ফিরে না যায়, সে জন্য তড়িঘড়ি করে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং হরিলুট হয়। 
দেশটা আসলে চলছে না। কিন্তু তবু তো চলছেই। খেয়েপরে বেঁচেই তো আছি। বাজারে গেলে তো চাল-ডাল কিনতেও পারি। আবার টাকা দিলে তো দোকানি জিনিসপাতি দেয়ও। এখনো তো এই নৈরাজ্য আসেনি, টাকা দিলাম, বললাম, দু কেজি চাল দাও, দোকানি গলা ধাক্কা দিয়ে বলল, টাকা দিলেই চাল দিতে হবে, এটা মগের মুল্লুক নাকি! এই যে বলছি, দেশ চলছে না, আবার বলছি চলছে, এই কথাটার মানে হলো, দেশের চাকা ঘোরাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের মেহনতি কৃষক। স্বাধীনতার সময়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল, এখন জনসংখ্যা তার দ্বিগুণ, কিন্তু কী বিপ্লবটাই না ঘটে গেছে কৃষিক্ষেত্রে, বছরে তিন ফসল, মাছ চাষে বিপ্লব, পোলট্রি খাতে বিপ্লব, এ কি যা-তা কথা। কাজ করছেন আমাদের উদ্যোক্তারা, ব্যবসায়ীরা, কারিগরেরা, শ্রমিকেরা। বিচিত্র ব্যবসা, বিচিত্র শিল্পোদ্যোগ। আর আছেন আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা, যাঁরা বহু কষ্টে বিদেশে যান, ততোধিক কষ্ট করে আয় করেন এবং দেশে টাকা পাঠান। এই যে প্রতিটা মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ, এটাই দেশের চাকাটা ঘোরাচ্ছে। আর আমরা, কতিপয় স্বার্থভোগী মানুষ, এই সাধারণ পরিশ্রমী সৎ মানুষের পথচলাটাকে প্রতিনিয়ত থামিয়ে দিয়ে বলছি, টাকা দাও। আমাদের কোটি কোটি টাকা দরকার। দাও দাও। আমাদের কর্তব্য ছিল তাদের চলার পথটা মসৃণ করব, তাদের চলার গতিটা ত্বরান্বিত করব, নির্বিঘ্ন করব, কিন্তু করছি উল্টোটা। দেশে যে যথাসময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় না, দেশে যে পদ্মা সেতু হয় না, সে দোষ তো গরিব দেশবাসীর নয়! কিন্তু ভুগতে হবে তাদেরই।
এ অবস্থায় আশা কোথায়?
দুই বছর পরে দেশটার কী হবে? যথাসময়ে নির্বাচন হবে? সেই নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে? ফলটা মোটামুটি গ্রহণীয় হবে, জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে নির্বাচনে? আমাদের মুদ্রার যে মাত্র দুটো পিঠ, দুই পিঠই তো আমরা দেখে ফেলেছি। আমরা যে বারবার ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপিত হচ্ছি। সেই কথাটা ভাবলেও তো চোখেমুখে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখি না। বাংলাদেশের মানুষের সামনে বাছাই করে নেওয়ার জন্য আছে দুটো দল বা জোট, হয় বিএনপি, নয়তো আওয়ামী লীগ। দুবার করে উভয়ের শাসনই দেখা হলো! তবু তো জনগণ পাঁচ বছর পর পর ভোট দিয়ে ক্ষমতায় কে যাবে নির্ধারণ করার মালিক ছিল, জনতার সেই ক্ষমতাটাও আদৌ থাকবে তো! আমাদের নেতাদের কথাবার্তা, হাবে-ভাবে বোঝা যায়, তাঁরা মনে করেন, তাঁরা খুব ভালো দেশ চালাচ্ছেন বা অতীতে চালিয়েছেন, তাঁদের আচার-আচরণ পরিবর্তনের কোনো কারণ ঘটেনি।
এ অবস্থায় আগামী পাঁচ বছর পরের বাংলাদেশটা কেমন হবে, কল্পনা করতে পারি না। দশ বছর পরের বাংলাদেশ কেমন হবে, হয়তো কল্পনা করা যায়, কিন্তু কল্পনা করার সাহস পাই না। একমাত্র উপায় হলো, কল্পনায় বিশ বছর পরের বাংলাদেশটাকে দেখা।
সেদিন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিনায়ক সেন, আকবর আলি খান এসেছিলেন প্রথম আলোর কার্যালয়ে, বাজেট নিয়ে কথা বলতে। ড. মোস্তাফিজুর রহমানই বললেন, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সাত বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়, আজকে যদি মাথাপিছু আয় ৮০০ ডলার হয়, সাত বছর পরে হবে ১৬০০ ডলার, ১৪ বছর পরে ৩২০০ ডলার, ২১ বছর পরে ৬৪০০ ডলার। সেটা একটা কল্পনা হতে পারে। আরেকটা কল্পনা হলো, শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া তখন অবসরে যাবেন। তখন দেশটার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে। আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে রাজনীতিতে পারিবারিক পরিচয়ই তো সবচেয়ে বড় উপাদান। 
থাক। কল্পনা করতে পারছি না। রংপুরে গিয়েছিলাম জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। ২৩০০ ছেলেমেয়ের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। এরা সবাই মাধ্যমিক পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো ফলটুকু অর্জন করে নিয়েছে। একজন বক্তৃতা করল, সে তিস্তা নদের জেলের ছেলে। সারা রাত বাবার সঙ্গে মাছ ধরে সকালবেলা ফিরেছে। বাবা বাজারে গিয়ে মাছ বেচে চাল কিনে ফিরেছেন, তারপর পরিবারের সবার খাবার জুটেছে। শিক্ষা একটা জাদুর কাঠি। কলকাতা থেকে কত দূরে ছিল বিদ্যাসাগরের বাড়ি, সেই যে হেঁটে হেঁটে মাইলফলক দেখে ধারাপাত শিখেছেন, আর কলকাতায় যে বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তাতে তাঁর পা পুরোটো মেলা যেত না। কিন্তু লেখাপড়া শিখে কেবল নিজে পাল্টে গেলেন না, সমাজটাকে পাল্টানোর ব্রতও তো গ্রহণ করলেন। পায়রাবন্দের রোকেয়া বাড়ির নিষেধ উপেক্ষা করে ইংরেজি আর বাংলা পড়তেন বলেই না আজ বাংলাদেশের নারীরা এতটা এগিয়ে! ৯০ ভাগের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, আশি হাজারেরও বেশি ছেলেমেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিশ বছর পর এই বাচ্চাদের বয়স হবে ৩৬-৩৭। ওরা দায়িত্ব নেবে এই দেশটা গড়ার। ওরা কৃষক হলে ভালো কৃষক হবে, শ্রমিক হলে লেখাপড়া জানা শ্রমিক হবে। ওদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে নতুন দিনের দেশ গড়ার কারিগরেরা। ওরা অনেকেই বিদেশ যাবে এবং পাঠাবে মূল্যবান বিদেশি মুদ্রা, আর পাঠাবে তার চেয়েও মূল্যবান জ্ঞান, প্রযুক্তি, আইডিয়া।
পুঁজি গড়ে ওঠার কালে নৈরাজ্য হয়, লুটপাট হয়। কিন্তু পুঁজি গড়ে ওঠার পরে নিজের স্বার্থেই নিজেকে পাহারা দেয়, তার তখন দরকার হয় আইনের শাসন। সেটা কি কুড়ি বছর পরে পাব না?
অন্যদিকে, সর্বব্যাপী লুটপাট, তার সঙ্গে ক্ষমতায় থাকার ওতপ্রোত সম্পর্ক আমাদের রাজনীতিকে করে তুলেছে সংঘাতময়, সেটা কত ভয়াবহ পর্যায় পর্যন্ত যাবে, আমরা জানি না। আইভরি কোস্টে দুজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীই নির্বাচনে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন, তারপর দুজনেই শপথ নিয়ে ফেলেছিলেন, তারপর শুরু হয়েছিল দুই পক্ষের মধ্যে সশস্ত্র লড়াই। আমরা কি সেই রকম সংঘর্ষের দিকে যাব? একটা ব্যাখ্যা হলো, আফ্রিকায় কৃষিসভ্যতাই আসেনি, আমরা কৃষিসভ্যতাটা পেয়েছিলাম। কাজেই একেবারে পুরোপুরি ব্যর্থ একটা রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আমাদের নেই। 
যে জাতি যে রকম, সেই জাতি সেই রকম নেতাই তৈরি করে। কিন্তু এই জাতি তো একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা, তাজউদ্দীন আহমদের মতো সংগঠক পেয়েছিল। সময়ও তো মানুষ তৈরি করে। আমরা কি একজন যোগ্য নেতা পাব না? নাকি যোগ্য নেতা পাওয়ার মতো যোগ্যতা এই জাতির হয়নি! দুঃখে আমার প্রাণ ফেটে যায়, যখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা চিকিৎসক বা প্রকৌশলীর মতো শিক্ষিত মানুষ নির্লজ্জ দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় শামিল হন! কিন্তু তারও চেয়ে অধিক দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের নেতারা এই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, কে কত বড়লোক হতে পারেন, কে কত কামিয়ে নিতে পারেন। না, বর্তমান নিয়ে শোক আর করব না! 
ভবিষ্যতের স্বপ্নই দেখি। একটা নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। তাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে দুনিয়া-সেরা ক্রিকেট অলরাউন্ডার, তারা এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওড়ায় দেশের পতাকা। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোগ, শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে আসছে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে, সৃজনশীলতা নিয়ে। 
তারা নিশ্চয়ই যোগ্য নেতা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়েই বেড়ে উঠছে, এগিয়ে আসছে।
আজ থেকে বিশ বছর পরে বাংলাদেশ যে একটা উন্নত আলোকিতসম্পন্ন বাংলাদেশ হবে, এটা একটা গাণিতিক বাস্তবতা। 
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Tuesday, June 12, 2012

তর্ক হচ্ছে কেন?

আনিসুল হক 


চলতি বাজেটে সরকার কথার ওপর ট্যাকসো বসাবে—এই রকম একটা হেডলাইন দেখে আমার হেডের হেডলাইটগুলো উঠল জ্বলে, বেহেড অবস্থায় পড়ে ফেললাম, ‘টক শোর ওপর ট্যাকসো’। সেই রকমটা হলে মন্দ হতো না, যদি টক শোতে কিংবা সাংবাদিকদের মাইক্রোফোনের সামনে কথা বললেই ট্যাক্স দিতে হতো! ভালো কথা বললে সেই ট্যাক্স ফিরিয়েও দেওয়া যাবে, তবে ফাউল কথা বললে ট্যাক্সের ফাইল মোটাই হতে থাকবে। কিন্তু খবরটা একটু যত্ন করে পড়ার পর বোধোদয় হলো, ট্যাকসোটা টক শো-ওয়ালাদের জন্য নয়, বাংলাদেশের ৬-৭ কোটি মোবাইল গ্রাহকের ট্যাক থেকে টাকা বের করার জন্য। ওই মোবাইল গ্রাহকদের মধ্যে বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ, সেটা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানবিদ হতে হয় না, কারণ দেশে কোটিপতির সংখ্যা আর যাই হোক, ৬-৭ কোটি নয়। এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে! কিন্তু এই দেশে কি তর্ক করা যায়? এই দেশে এখন একটাই সংলাপ, ‘তর্ক হচ্ছে কেন?’
কথার ওপর কর বসানোর পক্ষে আমি। জানি, কথাটা শুনতে খারাপ, কারণ তাতে মনে হয়, আমি বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছি। বাকস্বাধীনতা না থাকলে আমাদের সবাইকে নির্বাক হয়ে থাকতে হবে, সে হবে খুবই একটা অবাক ব্যাপার। কিন্তু ভুল কথা বলার চেয়ে কথা না বলাই কি শ্রেয় নয়?
আমরা অনবরত ভুল কথা বলে চলেছি বা ভুল বকে চলেছি। আমাদের কথার লাগাম নেই, তাই বুঝি আগাম কথা বলার ওপর আগাম ট্যাকসো বসানোর চেষ্টা চলছে, অন্তত মুঠোফোনে। মোবাইলে মোবাইলে যে কথা হয়, সে তো কানাকানি, কানে কানে কথা, তাতে দুজনের কর্ণপীড়া হতে পারে, আমাদের মর্মপীড়া হয় না। কিন্তু টেলিভিশনে, টক শোয়, আলোচনা অনুষ্ঠানে, আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে টেলিভিশন সাংবাদিকদের বাড়িয়ে দেওয়া মাইক্রোফোনে, সংসদে আমরা যেসব কথা বলি, তাতে কি অনেক সময় ভুল-বোঝাবুঝি, সেখান থেকে ঠোকাঠুকি, তার পর তা নিয়ে সর্বসাধারণের মাতামাতি, শেষতক পুলিশে-মানুষে হাতাহাতি হয় না? আমার নিজের ধারণা, কথা কম বলাই সর্বোত্তম। 
ভালো কথা অবশ্য শুনতে ভালোই লাগে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কথা বললে সেই কথা হাঁ করে শুনতে হয়। কিন্তু সবাই কি আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে তার কথা শুনতে ভালো লাগবে?
কথা তো বলতে জানতেও হয়। আর সবচেয়ে বেশি করে জানতে হয় থামতে। কোন জায়গায় থামতে হবে, তাও আমরা অনেক সময় জানি না। 
সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সুনাম ছিল এসব ব্যাপারে। 
একবার তিনি বক্তৃতা আরম্ভ করলেন,
‘প্রিয় কমরেড, ভাইসব, সাম্রাজ্যবাদের দালালগণ।’
পুরো সভা স্তব্ধ।
তিনি বলে চলেছেন, ‘কৃত চক্রান্তে দেশ হুমকিগ্রস্ত। তাদের কুকীর্তি এই কমিউজম, এই সমাজতন্ত্র। এই শ্রমিক-সংহতিকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে।’
তখন তাঁর উপদেষ্টা এগিয়ে এলেন। এবং পুরো বাক্যটা ঠিকভাবে তাঁর কানে পড়ে দিলেন।
‘প্রিয় কমরেড ভাইসব,
সাম্রাজ্যবাদের দালালগণ কৃত চক্রান্তে দেশ হুমকিগ্রস্ত। তাদের কুকীর্তি এই কমিউনিজম, এই সমাজতন্ত্র, এই শ্রমিক-সংহতিকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে।’
এই কৌতুক আমাদের দেশের একজন নেতাকে নিয়েও প্রচলিত ছিল।
তিনি নাকি বলেছিলেন,
‘ভাইসব, আপনারা গরু-ছাগল। আপনারা ভেড়া-মোষ। আপনারা হাঁসমুরগি। চাষ করুন।’
ব্রেজনেভকে নিয়ে আরও মজার মজার কথা প্রচলিত আছে। একবার প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ ছয় ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এর কারণ তিনি তাঁর বক্তৃতার কার্বন কপিও পড়ে শুনিয়েছিলেন।
আরেকবার জীবনের শেষভাগে দক্ষিণ রাশিয়ায় এক বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ব্রেজনেভ। সেখানে তাঁকে ভাষণ দিতে হবে। বিজ্ঞানের ওপর লেখা ভাষণের বদলে তিনি তুলে নেন সংগীতের ওপর লিখিত বক্তৃতা। তিনি সেই বক্তৃতার গোটাটাই পড়ে শুনিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা পিনপতন নিস্তব্ধতায় সেই ভাষণ শ্রবণ করেছিলেন। 
আমার ধারণা, এটা ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংয়ের বক্তৃতার চেয়ে ভালো হয়েছিল। জ্ঞানী জৈল সিং বিজ্ঞানী সম্মেলনে গিয়ে বলেছিলেন, আপনারা নাকি বলেন মানুষের পূর্বপুরুষ বানর ছিল। শোনেন, আপনাদের পূর্বপুরুষ বানর হতে পারে, আমার পূর্বপুরুষ মানুষই ছিল।
জ্ঞানী জৈল সিং নিয়ে আরেকটা কৌতুক। তিনি একবার শেক্সপিয়ারের ওপর আয়োজিত একটা সেমিনারে বক্তৃতা করতে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, শেক্সপিয়ারের একটা খুব বিখ্যাত নাটক হলো, টেক ইট দেয়ার (বাংলায়: উঠিয়ে নাও)।
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ‘টেক ইট দেয়ার’ নামে তো শেক্সপিয়ারের কোনো নাটক নেই।
তখন জ্ঞানী জৈল সিং বললেন, ‘আমি তো অনুবাদে পড়েছি। কথাটা ছিল, ওঠে-লো (Othello)।’
আমাদের দেশেও নানা প্রকার কথা দিয়ে অনেকেই চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ‘আল্লাহ্র মাল আল্লাহ্ নিয়ে গেছে’ থেকে শুরু করে ‘কম কম খান’, ‘হায়াত উঠে গিয়েছিল’, ‘পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন’, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো’ ইত্যাদি। 
এসব কথার ওপর ট্যাকসো না ধরে পুরস্কার ঘোষণা করা উচিত। এগুলো হলো লাখ কথার এক কথা। 
বেশি কথা বলার শাস্তি প্রকৃতিই আমাদের দিয়ে থাকে। মধ্যপন্থাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। নীরবতা হীরন্ময়। এবং পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
পুলিশের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে অনেকেই ভুলে যান। আর পুলিশের সঙ্গে বাক্য বিনিময় করা বা পুলিশের সামনে যুক্তি পেশ করার মতো বোকামিও মানুষ কখনো কখনো করে ফেলতে পারে। কিন্তু তার পরিণতি কী হতে পারে, আমরা তা ভুলে যাই। যেমন ভুলে গিয়েছিলেন একজন বিচারক। তিনি একজন জেলা যুগ্ম দায়রা জজ। তাঁর অপরাধ তিনি নিজ আদালত চত্বরে ঢুকছিলেন। পুলিশ তাঁর ব্যাগ তল্লাশি করতে চায়। বিচারক মহোদয় নিজের পরিচয় দেন। তখন পুলিশ তাঁর আইডি কার্ড দেখতে চায়। তিনি ইতস্তত করছিলেন। হয়তো তিনি বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে তিনিই বিচারক, কাজেই তাঁর পরিচয়পত্র দেখানোটা বাহুল্য। তিনি পরিচয়পত্র বের করেন। কিন্তু এই যে বাক্যবিনিময়, যুক্তি খণ্ডন ও পরিবেশন, অর্থাৎ কিনা তর্ক, তা তো পছন্দ নয় আমাদের পুলিশের। অন্য একজন পুলিশ সদস্য তেড়ে আসেন, তর্ক হচ্ছে কেন। পুলিশের হেলমেট আর লাঠির বাড়ি, কিলঘুষি সব পড়তে থাকে এই মাননীয় বিচারকের দেহের ওপর। 
আমরাও তাই বলি। তর্ক হচ্ছে কেন? তর্ক হবে কেন? আমরা তর্ক পছন্দ করি না। 
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Monday, June 4, 2012

পুকুরচুরি বিলচুরি নদীচুরি


পুকুরচুরির গল্পটা আমরা জানি। একটা পুকুর কাটা হবে। বরাদ্দ হলো লাখ টাকা। সেই টাকা ওঠানো হলো। কাজ চলছে, এই রকমই ধারণা কর্তৃপক্ষের। কিন্তু কাজ আসলে হয়নি। এক ফোঁটা মাটিও কাটা হয়নি। তারপর কর্তৃপক্ষ জানাল, পুকুরটা কেমন হয়েছে, দেখার জন্য ইন্সপেক্টর আসছে। তখন এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হলো। পুকুরটা এলাকায় বড় সমস্যা করছে। পচা পানিতে মশা উৎপন্ন হচ্ছে। এটা বোজাতে হবে। আবার লাখ টাকা বরাদ্দ হলো। তারপর একসময় ইন্সপেক্টর এলেন। এসে দেখলেন, কাজ হয়েছে পাকা। পুকুরটা এমন করে ভরাট করা হয়েছে, মনে হচ্ছে এখানে আদৌ কোনো পুকুর ছিলই না।
এটা আগের কালের গল্প। আজকের দিনের গল্প এই রকম হয় না। আগের দিনে এই অভিযোগ উঠত ঠিকাদারের বিরুদ্ধে, কিছুটা প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধেও। আজকের দিনে গল্পটা এই রকম:
এলাকায় একটা পুকুর কাটতে হবে। এলাকার প্রতিনিধি তদবিরে নামলেন। এক কোটি টাকা দরকার। এই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবানদের একজনের কাছে যেতে হলো। তিনি বললেন, কী প্রজেক্ট বানায়া আনছেন। গাধা নাকি! এক কোটি টাকায় পুকুর হয়! পাঁচ কোটি টাকার প্রজেক্ট বানান।
প্রতিনিধি সাহেব প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ দেখালেন পাঁচ কোটি টাকা। চার কোটি টাকা ওই বড় ভাই নিয়ে নিলেন। এক কোটি টাকা নিয়ে নিলেন প্রতিনিধি সাহেব। প্রকল্প এলাকায় কেউ গেলেন না। কাগজে-কলমে ওই পুকুর এলাকায় আছে। কেউ জানে না। জানার দরকার পড়ে না।
এই কৌতুকটাই এখন এই দেশে প্রচলিত হয়েছে। সেদিনও একজন কলাম লেখক তা পরিবেশন করেছেন। বাংলাদেশের এক কর্তাব্যক্তি বিদেশে গিয়ে সে দেশের সমপর্যায়ের এক কর্তাব্যক্তির বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলেন। বিশাল প্রাসাদ দেখে তাঁর চক্ষুস্থির। কেমন করে করলে এই বাড়ি? কয় টাকা বেতন পাও? তিনি জানালা দিয়ে দেখিয়ে বললেন, একটা সেতু দেখতে পাও? 
হ্যাঁ।
ওই সেতুর ফিফটি পারসেন্ট দিয়ে এই বাড়ি। 
ফিরতি সফরে সেই বিদেশি কর্তাব্যক্তি বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তির বাড়িতে উঠে একই প্রশ্ন করলেন। এই বাড়ি তো আমারটার চেয়েও বড় আর সৌকর্যময়। কয় টাকা বেতন পাও? করলে কী করে?
দেশি ব্যক্তি বিদেশিকে জানালার কাছে এনে বললেন, নদীর ওপর সেতু দেখতে পাও?
না।
ওই সেতুর হানড্রেড পারসেন্ট দিয়ে এই বাড়ি।
সবচেয়ে মজা হয় নদীতে বাঁধ দেওয়ার জন্য মাটি ফেলার সময়, বালুর বস্তা ফেলার সময়। কত বস্তা ফেলা হলো, আর তা প্রমত্তা নদী ভেঙেচুরে নিয়ে গেল, কে খোঁজ রাখবে। একই গল্প প্রযোজ্য হতে পারে কোনো শুকনো খাল পুনঃখননের বেলাতেও। কতটা মাটি কাটা হলো, কে রাখে তার খোঁজ।
কোম্পানির মাল দরিয়া মে ঢাল। দুর্নীতি সেই কোন অতীত আমল থেকে চলে আসছে এই দেশে। আকবর আলি খান তাঁর পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ে ‘শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন এই অঞ্চলে দুর্নীতি কত প্রাচীন। দুই হাজার বছর আগের মনুস্মৃতিতে আছে, ‘প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ করেন, তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে। রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে। রাজার দায়িত্ব হলো যেসব দুষ্ট লোক মামলায় বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’
দুই হাজার বছর আগের চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে লেখা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারীরা দুভাবে বড়লোক হয়: হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে।’ চাণক্য লিখেছেন, আকবর আলি খানের ইংরেজি থেকে অনূদিত বাংলায়, ‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিতরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’
আকবর আলি খান দেখিয়েছেন, বাদশাহি আমলে এই দেশে দুর্নীতি হয়েছে, ব্রিটিশ আমলে হয়েছে। আর এই আমলে?
আমার ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে। আমাদের পাড়াতেই থাকতেন এমপি সাহেব। আমি তখন হাফপ্যান্ট পরি। মামা চাকরির জন্য দরখাস্ত করবেন। তাঁর দরখাস্তে এমপির সুপারিশ লাগবে। আমি হাফপ্যান্ট পরে চলে গেলাম সকালবেলা এমপি সাহেবের বাসায়, তিনি দরখাস্ত দেখেই হাত বাড়িয়ে তাতে সুপারিশ করে দিলেন। আমিও হাসিমুখে চলে এলাম। এমপি নিয়োগ দিয়ে ঘুষ খান, এমপি স্কুলে ছাত্র ভর্তি করিয়ে ঘুষ খান, এ ধরনের ঘটনা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারত না।
আমার খুব দুর্ভাবনা হয়। দুর্নীতির কত ধরনের মুখরোচক গল্প যে শুনি। এই যে ৫০ কোটি টাকার কাজকে ৫০০ কোটি টাকার কাজ বানানোর গল্প শুনি, বাস্তবে তা-ই যদি ঘটে থাকে, তার প্রতিক্রিয়াটা কী হবে? ধরা যাক, সরকার একটা হেলিকপ্টার বা ট্রাক্টর কিনবে। তার দাম ১০ কোটি টাকা। সেটা কেনা হলো ১০০ কোটি টাকা দিয়ে। ৯০ কোটি টাকা চলে গেল কারও পকেটে। আচ্ছা, সেই ৯০ কোটি টাকা তিনি কোথায় রাখেন? ব্যাংকে নাকি বালিশের ভেতরে? ব্যাংকে রাখলে কোন ব্যাংক? দেশি ব্যাংক, নাকি বিদেশি ব্যাংক? নাকি সুইস ব্যাংক?
সরকারের এই টাকা সরকার পায় কোত্থেকে? গরিব মানুষ একটা সিনেমা দেখলে কর দেয়। একটা বিড়ি খেলে তাকে ট্যাক্স গুনতে হয়। আয়কর দেন জনগণ। আমদানি-রপ্তানি কেনাকাটা করতে খাজনা, শুল্ক, কর, ভ্যাট দিতে হয়। তার প্রতিটির প্রভাব পড়ে গরিব জনগণের ওপর। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব। হায়, আমার গরিব দেশের গরিব কৃষক-শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষ! তুমি কি জানো, তুমি নুন খেতে গিয়ে যে কর দিচ্ছ, তা তোমার দেশের রাজরাজড়ারা চুরি করছে!
কোনো পেশার দুর্নীতি নিয়ে দুর্নাম বহু পুরোনো। কাস্টমস, ট্যাক্সে যাঁরা চাকরি করেন, তহসিলদার সাহেব, প্রকৌশলী, দারোগা সাহেব, তাঁদের বাড়িটা পাকা হবে, তা এই দেশের মানুষ বহুদিন থেকে দেখে আসছে। কিন্তু সর্বস্তরে এমন সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কথা কি চল্লিশ বছর আগে কেউ ভাবতে পারত?
সর্বস্তরে দুর্নীতি। আগে ছিল পুকুরচুরি, এখন বিল-হ্রদচুরি, নদীচুরি, সমুদ্রচুরি চলছে। দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায়, লাইসেন্স দিতে, পারমিট দিতে। পুলিশ যদি ধরে তাহলে টাকা, যদি ছেড়ে দেয় তাহলে টাকা। যেখানেই কোনো সরকারি সার্টিফিকেট লাগবে, সেখানেই টাকা। ভাঙা গাড়ি ফিটনেস সার্টিফিকেট পাবে, টাকা থাকলেই। যে কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারে, টাকা খরচ করলেই। টেলিভিশনের পারমিশন থেকে শুরু করে পরিবেশ ছাড়পত্র, টাকা। নিয়োগের জন্য টাকা। বদলির জন্য টাকা। আর আছে জবরদখল। সরকারি জমি তো দখল হবেই, যেকোনো মানুষের জমি দখল করে টাকা নেওয়া যেতে পারে। নিজের জমিতে বাড়ি করবেন, টাকা গুনুন।
আশ্চর্য নয় যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার আর কোনো কথা বলে না। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বহুমুখী শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষমতাবান লোকেরা প্রতিবছর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবেন। দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেসব কথা আওয়ামী লীগ ভুলে গেছে। অর্থমন্ত্রী হতাশ, নাহ, আর হলো না।
কত টাকা লাগে একজন মানুষের, এক জীবনে? কেন একজন নেতা দুর্নীতি করবেন? কেন একজন এমপি এলাকার লোকদের কাছ থেকে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে টাকা নেবেন? 
কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই। শুধু বলতে চাই, পাওয়ার করাপ্টস অ্যান্ড অ্যাবসোলুট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসোলুটলি। ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হবে, দুর্নীতি তত বাড়বে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষ থেকে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র দুর্নীতির উন্মুক্ত ও উন্মত্ত চর্চা—আমরা যে অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। এখন এই দেশে শিক্ষকেরা পর্যন্ত দুর্নীতি করেন, চিকিৎসকেরা করেন, মাদ্রাসা প্রশাসনে পর্যন্ত দুর্নীতি হয়, আমরা যাব কই।
দুর্নীতি না হলে আমাদের রাস্তাঘাট ভালো থাকত। দুর্নীতি না হলে আমাদের বাস-ট্রেন সুন্দর হতো। দুর্নীতি না হলে আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যেত, সেগুলোর পরিবেশ উন্নত থাকত। দুর্নীতি না হলে মানুষ থানায় গিয়ে ভরসা পেত, বিচার পেত। দুর্নীতি না হলে কৃষক সস্তায় সার পেত, কৃষিপণ্য পেত। দুর্নীতি না হলে মানুষ বিদ্যুৎ পেত। দুর্নীতি না হলে জমিজমা নিয়ে এত মামলা-মোকদ্দমা হতো না। দুর্নীতি না হলে আমাদের ফলে কারবাইড বা ফরমালিন থাকত না, আমাদের নদীতে পানির বদলে আলকাতরা প্রবাহিত হতো না, আমাদের জমিজমা-নদ-নদী রাস্তাঘাট বেদখল হতো না।
আমি জানি না, এই সমস্যার সমাধান কী? আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘নিজেদের দুর্নীতি হ্রাসে সরকারি কর্মচারীদের সাধারণত কোনো আগ্রহ থাকে না, তাদের অনেকেই হচ্ছে দুর্নীতির প্রধান পোষক। রাজনৈতিক নেতারা অনেকেই দুর্নীতি দূর করতে চান। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের প্রতিরোধের মুখে তাঁরা অকার্যকর, অনেক সময় তাঁরা নিজেরাও একই ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।’
আমি তো রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে দুর্নীতি দূর করার কোনো প্রতিজ্ঞা দেখি না। আমরা কি দেশটাকে চুষে শুষে ফুলবনে মত্তহস্তির মতো সবকিছু পায়ে দলে শেষ করে দেব বলেই প্রতিজ্ঞা করে নেমেছি?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Monday, May 28, 2012

পুলিশ কেন মারে?


সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না?
সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না?
আমাদের তিন সহকর্মী রাজধানীর ট্রমা সেন্টারের বিছানায় শুয়ে আছেন। আমাদের একজন নিয়মিত প্রদায়ক কিলঘুষি খেয়ে প্রথম আলো অফিসে বসে ছিলেন, তাঁর শরীরজোড়া মারের দাগ, চোখ-মুখ ফোলা। পুরো ঘটনায় আমার কতগুলো অনুভূতি হচ্ছে। এক. নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। দুই. খুব অপমানিত বোধ করছি। তিন. নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে। চার. আমাদের দেশটা নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে উদ্বেগ সীমাহীনভাবে বেড়ে গেছে। সবটা মিলিয়ে যা তৈরি হয় তা ক্রোধ, ক্ষোভ, হতাশা।
প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার আর প্রদায়ক হাসান ইমামের ওই সময় (শনিবার, ২৬ মে, ২০১২, সকালবেলা) আগারগাঁওয়ের দিকে যাওয়ার কথা নয়। আমার বন্ধু নদী-বিশেষজ্ঞ ড. মনসুর রহমান ফোন করে আমাকে জানালেন, আগারগাঁওয়ে এক মিলনায়তনে তাঁরা একটা আন্তর্জাতিক সেমিনার করছেন। দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা একটা জনবহুল বদ্বীপের মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে, কীভাবে দারিদ্র্যমুক্ত থাকতে পারবে, তাই নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা তুলে ধরবেন। আমি সেই খবর ও ছবি সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম সংশ্লিষ্টদের। সেই খবর সংগ্রহ করতেই আলোকচিত্রী খালেদ সরকার আর প্রদায়ক হাসান ইমাম আগারগাঁওয়ে গিয়েছিলেন। খবর ও ছবি সংগ্রহ করে তাঁরা ফিরছিলেন।
ওই সময় তাঁরা দেখেন, রাস্তায় পলিটেকনিকের ছাত্রীরা বিক্ষোভ করছেন। 
খালেদ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা থেকে মাস্টার্স পাস করে প্রথম আলোয় আলোকচিত্র সাংবাদিকতা করেন। অত্যন্ত বিনয়ী, সদাহাসিমুখ, কর্তব্যপরায়ণ। রাস্তায় একটা ঘটনা ঘটছে, খালেদ ছবি তুলতে আরম্ভ করেন। অন্যদিকে এই ঘটনার ছবি তুলতেই আসেন প্রথম আলোর সাংবাদিক জাহিদুল করিম ও সাজিদ হোসেন।
তখন বিক্ষোভ প্রায় প্রশমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ছাত্রীরা তখনো রাস্তায় রয়ে গেছে। হঠাৎ কোনো ঘটনা ঘটলে ‘এক্সক্লুসিভ’ ছবি পাবেন, এই আশায় এক ফটোসাংবাদিক ফাঁকা রাস্তায় একটা পুলিশের গাড়ির পেছনে মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে থাকেন।
এই সময়েই পুলিশের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। পুলিশ বলে, আপনারা এই রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে আসছেন কেন? সাংবাদিক বলেন, ছবি তুলতে। একপর্যায়ে বলেন, যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে, আপনি মামলা করেন। গালিগালাজ করছেন কেন?
যাঁদের হাতে লাঠি আছে, অস্ত্র আছে, তাঁরা গালিগালাজ করবেন, তাঁদের কি জিজ্ঞেস করতে আছে, গালি দিচ্ছেন কেন? 
পুলিশের কর্তা নির্দেশ দেন পেটাও। সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না।
তারপর শুরু হয় বৃষ্টির মতো মার। কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে মার। রাস্তায় ফেলে মার। লাঠি দিয়ে বেধড়ক মার। কান বরাবর ঘুষি। রাইফেলের বাঁট দিয়ে মার। একজনকে মারতে দেখে আরেকজন সাংবাদিক ছুটে আসেন। তিনজন ফটোসাংবাদিকই প্রচণ্ড প্রহার-বৃষ্টির মধ্যে পড়েন। 
গত পরশু ট্রমা সেন্টারে গিয়ে মারের চোটে থেঁতলানো দেহ নিয়ে পড়ে থাকা তিন সাংবাদিককে দেখতে যাই। একজন বলেন, কোত্থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ এসে যে চড়াও হয় এবং প্রচণ্ড মার মারতে থাকে, আল্লাহই জানেন।
মারের চোটে একজনের ঠোঁট কেটে গেছে, দড়দড়িয়ে রক্ত পড়ছে। শরীর জোড়া তাঁদের মারের দাগ। ভেতরে মাংস থেঁতলে গেছে। সাজিদের কানের পেছনে এমন ঘুষি মেরেছে, ফুলে কালো হয়ে আছে জায়গাটা। আমাদের নিরীহ প্রদায়ক মোবাইল ফোনে এই মারধরের ছবি তুলছিলেন, এবার পুলিশ চড়াও হয় তাঁর ওপর। তাঁকে বেধড়ক কিলঘুষি মেরে তাঁর মোবাইল কেড়ে নেয়।
ওই পুলিশ সদস্যদের বড় আক্রোশ ছিল ক্যামেরার ওপর। তারা ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতে চায়। ক্যামেরা নিয়ে টানাটানি হয়। শেষ পর্যন্ত ক্যামেরা তারা কেড়ে নিয়েই ছাড়ে। এই সাংবাদিকদের থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে সারা পথে কিলঘুষি-চড় মারা হয়।
এসি শহীদুলের উক্তিটা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘এই রকম কত সাংবাদিক দেখছি, কত মারছি। এগুলান রে মারলে কিছু হয় না।’
এখানেই আসে আমার দ্বিতীয় অনুভূতিটার কথা। অপমানবোধ। পুলিশ কিন্তু সাংবাদিকদের মার শুরু করেছে কিলঘুষি-চড় দিয়ে, কলার ধরে টানাটানি দিয়ে। একজন সাংবাদিক হিসেবে এই চড় আমার নিজের গালে এসে লাগছে। আর ওই কথাটা? সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না। সত্যি তো, কিছু হয় না। আমার ছোট ভাই সাগর সরওয়ার, আমার ছোট বোন মেহেরুন রুনি নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হলো, তাদের দেবদূতের মতো ছেলেটা, মেঘ, বাবা-হত্যার বিচার দাবিতে রাস্তায় পর্যন্ত নামল, কী হয়েছে? কিছু হয় না তো আসলে।
ট্রমা সেন্টারে যখন আমি আহত ক্ষত-বিক্ষত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলি, ওঁরা বলেন, কোথাও কোনো বড় গণ্ডগোল হলে সাংবাদিকেরা মারের মধ্যে পড়ে যান, আহত হন, আমরা তো সেটা আমাদের কাজের অংশই ধরে নিয়েছি। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া, কোনো উত্তেজনা ছাড়া শুধু সাংবাদিক পেটানোর জন্যই একযোগে নিরস্ত্র কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়া আর নির্মমভাবে মারা, যেন একটা স্যাডিজমের লক্ষণ; অন্যকে পীড়িত-অত্যাচারিত হতে দেখে আনন্দিত হওয়া।
এ থেকে একটা সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়। সাগর-রুনি মারা যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে, বিদেশি কূটনীতিক মারা যাচ্ছেন রাস্তায়, রাজনৈতিক নেতা বা গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা হারিয়ে যাচ্ছেন রাজপথ থেকে, পুলিশ রাজনৈতিক নেতাদের পেটাচ্ছে, শিক্ষকদের পেটাচ্ছে, সাংবাদিকদের পেটাচ্ছে, সংসদ সদস্যকে পেটাচ্ছে। এর আগে পুলিশ কমনওয়েলথে স্বর্ণপদক পাওয়া আসিফকে পিটিয়েছিল।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে কূলকিনারা না হওয়া থেকে শুরু করে গাড়িতে তিন কর্তব্যরত সাংবাদিককে তুলে সারাটা পথ পেটাতে পেটাতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা একত্র করলে একটা তীব্র হতাশার বোধ তৈরি হয় না কি? তার মানে এটা একটা নৈরাজ্যের লক্ষণ। 
পুলিশের হাতে লাঠি আছে। পুলিশের হাতে অস্ত্র আছে। সেই কারণেই তাদের শৃঙ্খলার পরিচয় দিতে হবে, সেই কারণেই তাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আপনি গাড়িতে তুলে সাংবাদিককে মারলেন কোন আইনের বলে?
যদি কেউ রং সাইডে মোটরসাইকেল চালিয়ে থাকে, তাহলে তাকে আপনি মারবেন কেন? তার ক্যামেরা কেড়ে নেবেন কেন? কোন আইনের ধারায় আপনি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিচ্ছেন। মেমরি কার্ড খুলে নিলেন কোন আইনে?

২.
অথচ পুলিশের কাছে আমরা যাই ভরসার সন্ধানে। একটা ঘটনা বলি। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমি একজন তরুণ সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস নামের একটা কাগজ আমরা বের করি। যেদিন পত্রিকা ছাপা হবে, কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়। স্টেডিয়ামের পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে হাঁটছি, এরই মধ্যে কারফিউ শুরু হয়ে গেছে। কোনো যানবাহন নেই রাস্তায়। আমাকে যেতে হবে বকশীবাজার। একটা পুলিশের গাড়ি এসে আমার পাশে থামে। আমাকে বলে, কারফিউ শুরু হয়ে যাচ্ছে, আপনি কই যান? আমি বলি, আমি সাংবাদিক, কাজ শেষ করে ঘরে ফিরছি। ওরা বলেন, রাস্তায় মিলিটারি নেমেছে, আমরা না হয় আপনাকে ছেড়ে দিলাম, মিলিটারির সামনে পড়লে যদি আপনার কিছু হয়। আমি বলি, আমি তো কোনো যানবাহন পাচ্ছি না। একটা কাজ করেন, আমাকে আপনাদের গাড়িতে তুলে একটু বকশীবাজারে নামিয়ে দেন।
ওরা আমাকে গাড়ি করে বকশীবাজারের মোড়ে নামিয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানি, পুলিশ সম্পর্কে মানুষের ধারণা, যাকে বলে, পারসেপশন, সেটা নেতিবাচক। কারা দুর্নীতি বেশি করে, অর্থমন্ত্রী সেই দিনও যে তালিকা দিয়েছেন, তাতে পুলিশের নাম আছে।
কিন্তু আমি সাধারণভাবে, অতিসরলীকৃতভাবে কথা বলতে চাই না। ভালো মানুষ সব পেশাতেই আছেন। খারাপ মানুষও সব পেশাতেই আছেন। সাংবাদিকদের মধ্যেও ভালো-খারাপ আছে।
পুলিশের বর্তমান আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকারকে অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি মৃদভাষী অমায়িক একজন মানুষ বলে আমার মনে হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার বেনজির আহমেদের একটা বক্তৃতা শুনে আমি কী যে মুগ্ধ হয়েছি। নিখোঁজ মানুষদের সন্ধানে একটা আশ্রয়কেন্দ্র হবে, সেই উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা করলেন। তিনি এই উপমহাদেশে কত কারণে মানুষ হারিয়ে যায়, তার সামাজিক কারণ, ঐতিহাসিক কারণ, আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে কোথায় কবে হারিয়ে যাওয়ার কী প্রসঙ্গ আছে, এমন সুন্দর করে বললেন যে আমি একেবারে থ বনে গেলাম। আমার লেখা ছাপা হলে যাঁরা সেটার ভালোমন্দ আলোচনা করতে ফোন করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পুলিশ অফিসার। সেদিনও পুলিশের একজন ডিআইজির সঙ্গে দেখা হলো, তিনি গোয়েন্দা শাখায় আছেন, প্রথম কথাই হলো, আনিস ভাই, আমরা কিন্তু আপনার ‘মা’ বইয়ের ভক্ত। আমি এটা জানি, মা বইটা পুলিশের অনেক কর্তা নিজেরা পড়েন, আর অন্যদের কিনে কিনে উপহার দেন। এই নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশ নামে একটা আন্দোলন পুলিশ করার চেষ্টা করছে, আমি তাদের অনুষ্ঠানে মিরপুরে ও উত্তরায় বক্তৃতা দিতে গেছি।
আর আমি ভুলতে পারি না যে একাত্তর সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাকে কী নৃশংস হামলাই না করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। পুলিশও সেদিন বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন অনেকেই। সেই সব শহীদের নাম রাজারবাগের স্মৃতিফলকে উৎকীর্ণ আছে।
আমি যখন কোনো মোড়ে যানজটে আটকা পড়ি, আমি পুলিশ কনস্টেবলদের দেখি, কী রোদে কী বৃষ্টিতে এই বিশৃঙ্খল যানগুলোকে ‘লাইনে’ আনতে কী প্রাণান্তকর পরিশ্রমই তাঁরা করছেন। দূষণকারী ধোঁয়ার মধ্যে নিজেকে ক্ষয়ে দিতে দিতে যানবাহনের গতিটাকে সচল রাখতে কী মরিয়া চেষ্টাই না করে চলেছেন বেচারা।
কাজেই পুলিশকে যখন ঢালাওভাবে গালিগালাজ করা হয়, আমি সেটাকে সমর্থন করতে পারি না। 
কিন্তু এর সঙ্গে যখন সহকারী কমিশনার শহীদুল ইসলামের উক্তি মেলাই, সাংবাদিক মারলে কিছু হয় না, তখন সত্যি ভীষণ অপমানিত বোধ করি।
এই মানসিকতা, এই মনোভাবের উৎস কী?
আইনের বাইরে গিয়ে, এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে পুলিশি পদক্ষেপকে যখন রাষ্ট্র উৎসাহিত করছে, এর একটা প্রভাব এই ধরনের মানসিকতার একটা কারণ হতে পারে।
রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। 
আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে, অবশেষে পুলিশও গাইল রবীন্দ্রসংগীত।
সত্যি সত্যি পুলিশকে সুসংস্কৃত, সুশিক্ষিত হতে হবে। আমি আমার চেয়ে অনেক গুণ বেশি লেখাপড়া করা, সংস্কৃতিচর্চা করা পুলিশের দেখা পেয়েছি। তাঁদের এই সংস্কৃতিবোধটা পুরো পুলিশ বাহিনীতেই ছড়িয়ে দিতে হবে। সে জন্য যেমন তাঁদের প্রশিক্ষণের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করে তুলতে হবে যে প্রতিটা মানুষ সমান, প্রতিটা মানুষের জীবন মূল্যবান, প্রতিটা মানুষের সম্মানই সম্মান, পুলিশের কাজ মানুষকে রক্ষা করা, তাকে আহত করা, অসম্মান করা নয়; তেমনি এর অন্যথা হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নিতে হবে। যাতে কতিপয়ের জন্য সমগ্রের সম্মানহানি না ঘটে।
এই একটা ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা পুলিশ প্রশাসন গ্রহণ করে, তা শেষ পর্যন্ত মনিটর করার জন্য আমি সাংবাদিকদের অনুরোধ করব।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Monday, May 21, 2012

যে দেশে হরতাল নামের এক জিনিস আছে


হরতাল পলিসি ফর বাংলাদেশ। ব্রিটিশ কাউন্সিল সারা পৃথিবীতেই ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নিচ্ছে একই সময়ে—সাধারণত যা ‘ও-লেভেল’ আর ‘এ-লেভেল’ পরীক্ষা বলে পরিচিত। সারা পৃথিবীর সব দেশের জন্যই তারা একটা পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করেছে। শুধু বাংলাদেশের জন্য তাদের অতিরিক্ত নিয়ম যুক্ত করতে হয়েছে সেই রুটিনে। তাদের রুটিনে লেখা আছে: হরতাল পলিসি ফর বাংলাদেশ। 
পলিসিটা বেশ বড়সড়। মোদ্দা কথা হলো, যদি ১২ ঘণ্টা হরতাল হয়, তাহলে দুপুরের পরীক্ষা সন্ধ্যার পরে, আর বিকেলের পরীক্ষা রাত ১২টায় শুরু হবে। আর হরতাল যদি ২৪ ঘণ্টার হয়, তাহলে এবারের পরীক্ষা বাতিল, সামনের বছর জানুয়ারিতে সেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
হ্যাঁ, পরীক্ষার দিনে হরতাল ডাকা হয়েছে। হাজারও পরীক্ষার্থী আর তাদের উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা মধ্যরাতে পরীক্ষার হলে গেছেন। বাচ্চাদের যখন ঘুমের সময়, চোখ রগড়ে তারা তখন পরীক্ষা দিচ্ছিল, আর তাদের অভিভাবকেরা হলের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে-বসে হাই তুলছিলেন।
পৃথিবীতে কত দেশ। কত বিচিত্র ধরনের মানুষ। এর মধ্যে একটা দেশই আছে, যারা নিয়মিতভাবে হরতাল করে। হরতাল জিনিসটা দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। সর্বভারতীয় বন্ধ্ আজকাল আর ডাকা হয় বলে আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ, আমাদের বাঙালি ভাইয়েরা পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ্ আহ্বান করে থাকেন। ভারতের একটা-দুটো রাজ্যে বন্ধ্ ডাকা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সেটা বছরে-দুবছরে এক-আধবার হতে পারে; নিয়মিতভাবে হরতাল, ‘লাগাতার হরতাল’, ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত হরতাল’, ‘অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত হরতাল’—এসব এই একুশ শতকে পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে অহিংস পথে পরিচালিত করার জন্য হরতাল নামের এই গুজরাটি শব্দটি চালু করেছিলেন। ব্রিটিশরা চলে গেছে, মহাত্মারাও আজকাল আর পৃথিবীতে জন্মান না, কিন্তু হরতাল জিনিসটা পৃথিবীর সব দেশ থেকে উঠে গিয়ে এই বাংলাদেশে এসেই স্থায়ীভাবে গেড়ে বসেছে। 
ভূমিকম্প কখন আসবে, পূর্বাভাস দেওয়ার যন্ত্র বা প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি। আকাশে মেঘ দেখা দিলে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া যায়। সমুদ্র উপকূলে জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস সময় থাকতেই দিয়ে দেওয়া যায়, লোকজন সরেও যেতে পারে। কিন্তু ওই সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসের আগমন প্রতিরোধ করা যায় না। হরতাল আমরা প্রতিরোধ করতে পারি না। কিন্তু আমরা এখন শিখে গেছি, বলতে পারি, কবে হরতাল হবে। বিএনপির ৩৩ জন নেতাকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হলো। সঙ্গে সঙ্গে মুঠোফোনে, ফোনে একটা কথাই বলাবলি হয়েছে, হরতালটা কবে, বৃহস্পতিবার, নাকি রোববার? সবাই জানে, হরতাল অনিবার্য। কবে আর কত দিনের জন্য, সকাল-সন্ধ্যা নাকি তারও বেশি, এটাই ছিল প্রশ্ন। হরতালের দিনের চেয়ে হরতালের আগের বিকেলটা বেশি ভয়াবহ। কারণ, বিকেলে গাড়িতে আগুন দেওয়া হবে। গাড়িতে দু-চারজন যাত্রী, চালক জীবন্ত দগ্ধ হবেন। এটাও আমাদের জানা। সর্বশেষ হরতালের আগের দিনেও তা-ই হলো। রাত নয়টার দিকে একজন মুঠোফোনে কথা বলছেন, আমি শুনছি, ‘না, না, এত রাতে আর গাড়ি পোড়াবে না, টেলিভিশনের খবরগুলো হয়ে গেছে, পত্রিকার সাংবাদিকেরাও এখন রাস্তায় নেই, এত রাতে গাড়ি পোড়ানোর কথা নয়, আপনি নিশ্চিন্তে চলে আসুন।’ 
কেন্দ্রীয় নেতাদের কারাগারে পাঠানোর আগের ঘটনা ইলিয়াস আলীর গুম হয়ে যাওয়া। এই পর্যায়ের একজন নেতাকে রাজপথ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে ড্রাইভারসমেত, তার গাড়ি পড়ে রইবে রাস্তায়, তার পরও বিরোধী দল চুপচাপ সেটা মেনে নেবে, এটা কেউ ভাবেনি। কাজেই দেশের মানুষ প্রস্তুত হয়েই ছিল, কবে হরতাল, কত দিনের জন্য হরতাল।
দেশের সাধারণ মানুষই বোঝে, কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় হরতাল আসবে। অথচ সরকার তা জানে না, তা হয় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। সেটা হাতে পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে সংবিধান কেন সংশোধন করে ফেলা হলো, সেই বিস্ময় আমার যায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেওয়া হলে বিরোধী দলগুলো সেটা মানবে না, কাজেই তারা রাজপথে আন্দোলনে যাবে, সেটা যেকোনো বাচ্চা ছেলেও বোঝে। এই সংশোধনী তো সরকার তার ক্ষমতা-মেয়াদের একেবারে শেষ ভাগেও করতে পারত। তাড়াহুড়াটা কেন?
সরকারের নিশ্চয়ই অনেক সাফল্য আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তরিক চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ব্যর্থতাও আসতে পারে। কিন্তু জেনেশুনে বিষপানের মতো ঘটনা একটার পর একটা কেন সরকার ঘটাচ্ছে, আমি অনেক চিন্তা করেও কোনো সমাধান পাই না। কতগুলো ইস্যু অপ্রয়োজনে তৈরি করে বিরোধী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যেসবের কোনো দরকারই ছিল না। ধরা যাক, বিদ্যুৎ-সমস্যার সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এনে সমস্যার দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করেছে; কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এটার সাফল্য-ব্যর্থতা এবং তার কারণ নিয়ে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারি। কিন্তু বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঢালাও অভিযোগ এনে তাঁদের গ্রেপ্তার করার পরিণতি কী হবে, সেটা কি সরকার বোঝে না? এই সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছেন? কীভাবে নিচ্ছেন?
সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপির আচরণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যা প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে আমাদের মাথা হেট হয়ে আসে। কারও পিএস টাকার থলি নিয়ে ধরা পড়েন, কারও বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং সব ধরনের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। আচ্ছা, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক টাকা দেবে না, কাজেই আমরা মালয়েশিয়া থেকে টাকা আনব, তাতে যদি সুদের হার বেশি দিতে হয়, সেই অতিরিক্ত টাকাটা কে দেবে? সরকারের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সেটা যদি কাল্পনিক আর বানোয়াটও হয়, তার দায় কেন জনগণ নেবে? সেই অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে সহজ শর্তে তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব সরকারের, পাবলিকের নয়।
কোনো এমপির গাড়িতে গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়, কোনো এমপি জনতার উদ্দেশে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি ছুড়ছেন, সেই ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সরকার ও প্রশাসনের চরম দুর্নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজে হতাশা প্রকাশ করেন। সর্বত্র দলীয়করণ, নিয়োগ-বাণিজ্য ও লুটপাট। এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ভূমিদস্যুতার। স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করানোর বিনিময়ে এমপি টাকা খান, লোক নিয়োগের নাম করে একই পদের বিপরীতে এলাকার একাধিক মানুষের কাছ থেকে টাকা খাওয়ার অভিযোগ ওঠে এমপির বিরুদ্ধে। একদিকে দেশ চালাতে গিয়ে নানা সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে সরকারের ব্যর্থতাগুলো যেমন প্রকট হয়ে উঠছে, তেমনি কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপি বা পদস্থের আচার-আচরণ সরকার-সমর্থকদের মুখে চুনকালি মেখে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিরোধ মোকাবিলায় সরকারের আচরণ অসহিষ্ণু, নিপীড়নমূলক ও অগণতান্ত্রিক। বুঝতাম তা যদি কার্যকর হতো। মানে বলতে চাচ্ছি, দমন-নিপীড়ন করেও যদি সরকার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারত, তবুও না হয় একটা সান্ত্বনা পাওয়া যেত। তা তো হচ্ছে না। নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এবং সরকারের একেকটা পদক্ষেপে তার জনপ্রিয়তায় একটা করে ধস নামছে।
যখন ব্যর্থতা আসে, তখন এমনি করেই আসে। একটার পর একটা ব্যর্থতার ঢেউ এসে আঘাত আনে। আর স্থানে স্থানে এমন সব কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে, মুখে চুনকালি পড়তে থাকে। তখন সরকারগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে, বাজে বকতে থাকে, দমনপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ভাবতে থাকে, আমার মতো শক্তিশালী জগতে আর কেউ নেই। আমার মতো জনপ্রিয়ও পৃথিবীতে আর কেউ নেই। কিন্তু পায়ের নিচের মাটি সরতে থাকে। তারপর যখন সরকারের পতন হয়, তখন সেটা হয় খুবই করুণ, খুবই শোচনীয়।
ইতিহাস পুনরাবৃত্তিময়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
এর মধ্যে রাজনীতিতে একটা সামান্য আশার আলো ফুটেছে। তা হলো, হরতালের বদলে বিরোধী দলের অনশন কর্মসূচিকে লোকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপিও বলেছে, তারা হরতাল আহ্বান করতে চায় না। এই ছোট্ট আশাপ্রদ সূত্রটাকে ধরে উভয় পক্ষ কি এগিয়ে যেতে পারে না? সরকারের দিক থেকে সমঝোতার একটা চেষ্টা কি নেওয়া যায় না? রাজনৈতিক সমস্যার কোনো পুলিশি সমাধান নেই, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এটা না বোঝার মতো বোকা হতেই পারে না। সেখানেই আমাদের সামনে এক রহস্যময় ধাঁধা, রাজনৈতিক বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কি রাজনীতিকেরা নিচ্ছেন, নাকি অরাজনৈতিক কোনো উপদেষ্টা চক্রের হাতে পড়ে গেছে দেশ?
এই কলামের নাম ‘অরণ্যে রোদন’। কাজেই আমাকে অরণ্যে রোদন করে যেতেই হবে। রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে এগিয়ে আসুন। আরও দেড় বছর নির্বিঘ্নে দেশ চালনা করে সময়মতো নির্বাচন দিন। হরতাল আসতে পারে, এমন ঘটনা ঘটানো থেকে বিরত থাকুন।
আমি জানি, আমার এই কথা অরণ্যে রোদন মাত্র। একটা ভুল আরেকটা ভুল ডেকে আনে, একটা ভুল ঢাকার জন্য আরও ভুলের সিরিজ ডেকে আনা হয়।
আহা, এই দেশের সৃষ্টিশীল উদ্যমী মানুষগুলোর জন্য আমার কেবল মায়াই হয়, আফসোসই হয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কত বিরূপ, এর মধ্যেই কৃষকেরা বাম্পার ফসল ফলাচ্ছেন, শ্রমিকেরা-উদ্যোক্তারা-ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছেন, প্রবৃদ্ধি অর্জন করছেন। নিশাত মজুমদারেরা এভারেস্টে উঠে বাংলাদেশের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন। আমাদের রাজনীতি যদি একটু মানুষবান্ধব হতো, আমরা কোথায় পৌঁছাতাম।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।


Monday, May 14, 2012

এক অক্ষম লেখকের আরেকটা ব্যর্থ রচনা

একটা সত্যি ঘটনা আপনাদের বলি। 
১৯৯৭ সাল। ২ অক্টোবর থেকে ভোরের কাগজ-এ প্রতিবেদক জায়েদুল আহসানের একটা ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে লাগল। বিষয়: ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর রহস্যময় সামরিক অভ্যুত্থান ও সৈনিকদের গণফাঁসি। 
২০ বছর আগের ঘটনায় যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের নামের তালিকা ভোরের কাগজ-এ প্রকাশিত হলো।
এই সময় ভোরের কাগজ-এর বাংলামোটর দপ্তরে এলেন একজন মা আর তাঁর যুবক পুত্র। 
এই নারীর স্বামী আজ থেকে ২০ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছেন। তিনি জানেন না, তাঁর স্বামীর কী পরিণতি হয়েছে। তিনি কি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। মারা গেলে কবে, কোথায় কীভাবে মারা গেছেন।
এই যুবক জানেন না, তাঁর বাবা কোথায়? বাবার কোনো স্মৃতিও তাঁর মনে নেই। 
তাঁরা শুনেছেন, ভোরের কাগজ-এ ফাঁসিপ্রাপ্ত সৈনিকদের নামের তালিকা ছাপা হয়েছে।
তাঁরা সেই কাগজটা দেখতে চান। 
তাঁরা জানতে চান, তাঁদের স্বামী/বাবার নাম এই তালিকায় আছে কি না।
তাঁরা ভোরের কাগজ অফিসের দোতলায় বসলেন। 
তাঁদের সামনে ভোরের কাগজ-এর উদ্দিষ্ট সংখ্যাটা মেলে ধরা হলো। তাঁরা দীর্ঘ তালিকাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লেন।
তাঁদের বাবা/স্বামীর নাম পাওয়া গেল। তাঁরা জানলেন, ২০ বছর আগে তাঁদের প্রিয় মানুষটির ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
ছেলেটি বললেন, সামনেই বাবার মৃত্যুদিবস। এই বার আমরা তাঁর মৃত্যুর দিনটা পালন করতে পারব।
মা আর ছেলে ভোরের কাগজ অফিস থেকে ধীর পায়ে নেমে গেলেন।

২.
আসুন, আমরা আরেকটা কাহিনি নির্মাণ করি। একজন ২০ বছর বয়সের তরুণী। তাঁর নাম, ধরা যাক, নিলুফার বানু। তাঁর একটা ছেলে। নাম খোকা। খোকা কেবল হাঁটতে শিখেছে। দাদা, মামা, মাম—এ ধরনের কয়েকটা শব্দও খোকা বলতে পারে।
নিলুফারদের মধ্যবিত্ত পরিবার। বাড়িতে রঙিন টেলিভিশন, ফ্রিজ আছে। ব্যাংকে তাঁর স্বামীর জমানো টাকা আছে ১০-১৫ লাখ। স্বামী একটা ফ্ল্যাট কিনবেন বলে টাকা জমাচ্ছেন।
একদিন তাঁর স্বামী প্রতিদিনের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর ফিরে এলেন না।
নিলুফার কান্নাকাটি করলেন। মূর্ছা গেলেন কয়েকবার। থানা থেকে থানায় দৌড়ালেন। লাশ পাওয়া গেছে খবর পেলেই ছুটে গেলেন মর্গে। হাসপাতালে হাসপাতালে খবর নিলেন। পত্রিকায় নিখোঁজ স্বামীর ছবি ছাপা হলো। 
কিন্তু স্বামী ফিরে এলেন না।
ছেলে বড় হচ্ছে। তাঁদের সংসারও তো চালাতে হবে। নিলুফার ব্যাংকে গেলেন। বললেন, ব্যাংকের টাকাটা তুলতে হবে। আমাকে তিনি নমিনি করে গেছেন। আমি জানি। টাকাটা আমি তুলব।
ব্যাংকের ম্যানেজার তাঁকে দেখামাত্রই চিনলেন। বললেন, আপনার ঘটনা আমরা জানি। আমাদের সমবেদনা রইল। কিন্তু আপনার স্বামী যেহেতু মারা যাননি, কাজেই আপনি এই টাকা তুলতে পারবেন না। তিনি তো যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারেন।
গ্রামে স্বামীর নামে দুই বিঘা জমি ছিল। নিলুফার ভাবলেন, জমিটা বিক্রি করে দেবেন।
কিন্তু তিনি তাও পারবেন না। কারণ, তাঁর স্বামী মারা যাননি। আইনত, তাঁকে এক যুগ অপেক্ষা করতে হবে তাঁর স্বামীর ফিরে না আসার জন্য।
নিলুফারের বাবা-মা ভাবলেন, মেয়েকে আরেকবার বিয়ে দেওয়া দরকার।
কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। কারণ, নিলুফারের স্বামী মারা যাননি। নিখোঁজ হয়েছেন। বিয়ের পরের দিনই যদি খোকার বাবা ফিরে আসেন, তখন কী কাণ্ডটাই না ঘটবে।

৩.
প্রথম আলোর প্রথম পাতাতেই খবরটা ছাপা হয়েছিল। গুম বিষয়ে। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন বিলাপ করে বলেছিলেন, এর চেয়ে ‘ক্রসফায়ার’ তো ভালো ছিল। নিশ্চিত হওয়া যেত যে মারা গেছে। কোথায়, কবে মারা গেছে তা-ও জানা যেত। লাশটাও পাওয়া যেত। কিন্তু এ যে ঘোরতর অনিশ্চয়তা!

৪.
কেন লিখি। কেন এই রকম লিখি। এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আমি রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিই।
বলি:
‘সংসার-মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দু-একটি কাঁটা করি দিব দূর—
তার পরে ছুটি নিব।
সুখহাসি আরো হবে উজ্জ্বল,
সুন্দর হবে নয়নের জল,
স্নেহসুধামাখা বাসগৃহতল
আরো আপনার হবে।
প্রেয়সী নারীর নয়নে অধরে
আরেকটু মধু দিয়ে যাব ভরে,
আরেকটু স্নেহ শিশুমুখ-’পরে 
শিশিরের মতো রবে।’
উদ্ধৃতি দেওয়াই সার। একটা কাঁটাও দূর করতে পারি না। একটা শিশুর মুখেও স্নেহের শিশির জোগাতে পারি না। স্নেহসুধায় আরেকটু আপনার করে তুলতে পারি না কোনো বাসগৃহতল।
কী যে খারাপ লাগে!
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।